মার্কসের বিচার রীতি
মার্কসতত্ত্বের একটি সাধারণ এবং সর্বাঙ্গীণ পরিচয় আমরা লাভ করতে পারি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘কেপিটেলে’ সন্নিবিষ্ট মার্কস ও এঙ্গেলসÑএর মুখবন্ধগুলি হইতে। একটি পণ্য কি কারণে অপর একটি পণ্যের সহিত বিনিময় হয়, অথবা একটি বিশেষ পরিমাণের মুদ্রায় বাজারে বিক্রয় হয়, প্রতিদিনের এই ঘটনাটির পশ্চাতে যে রহস্য লুক্কায়িত রহিয়াছে তাহার উদ্ঘাটন মার্কসের পূর্বে দুই হাজার বৎসর সম্ভবপর হন নাই। এরিস্টটল ইহার উত্তর দিতে চেষ্টা করিয়াছেন; এডাম স্মিথ এবং রিকার্ডো অনেকখানি অগ্রসর হইয়াও সফল হন নাই। এই দুই হাজার বৎসরে অনেক রকমের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আবিষ্কার সম্ভব হইয়াছে; কিন্তু পণ্যে মূল্যরূপের (value form) মতো একটি ক্ষুদ্র প্রতিদিনের প্রত্যক্ষের বিষয় সম্বন্ধে বিচার ও বিশ্লেষণে যত সহজ, তাহার মূল-ভিত্তি জীবকোষ সম্পর্কে ধারণা তত সহজ হইতে পারে না।
অর্থনৈতিক-কাঠামো সম্পর্কে বিচার আরো কঠিন। ইহার জন্য যেমন কোন বিজ্ঞানাগার নাই, তেমনি পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের জন্যও কোন অনুবীক্ষণ যন্ত্র অথবা রাসায়নিক পরীক্ষা প্রক্রিয়া নাই। সামাজিক বিষয়ে যে উপায় এবং চিন্তাপ্রণালী অবলম্বন করিতে হইবে, তাহা হইল বিয়োজনরীতি (abstraction)। মানুষের শ্রমজাত দ্রব্যের পণ্যরূপ (commodity form) অথবা পণ্যের মূল্যরূপই হইল বুর্জোয়া-সমাজের অর্থনৈতিক জীবকোষ। ইহাকে ভিত্তি করিয়া এবং মূল ধরিয়া বুর্জোয়া অর্থনৈতিক সমাজ কাঠামোকে পরিষ্কার বুঝা যাইবে।
মার্কসের বিচারের বিষয় পুঁজিতন্ত্রী সমাজের অন্তর্ভুক্ত উৎপাদন-প্রথা এবং বিনিময় ব্যবস্থা। মার্কসের সময়ে আদর্শ পুঁজিতন্ত্রী-সমাজ ছিল ইংল্যান্ড। ইহাই একমাত্র কারণ, কেন মার্কস তাঁহার বৈজ্ঞানিক মতবাদ গড়িয়া তুলিবার জন্য সাক্ষ্য ও নিদর্শনরূপে ধরিয়াছেন ইংল্যান্ডকে। পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদনের প্রভাবে বিশেষ একটি সমাজ শ্রেণীসংঘর্ষের দিকে কি পরিমাণ অগ্রসর হইয়াছে তাহা বিশদভাবে দেখিবার বিষয় নয়। দেখিতে হইবে, এই বিশিষ্ট উৎপাদন প্রথার পশ্চাতে যে মূলীভূত সত্য এবং সূত্র রহিয়াছে তাহা কি করিয়া অবশ্যম্ভাবীরূপে এবং অপ্রতিরোধ্যভাবে তাহার আপনার গড়ন এবং ভাঙনের কাজ করিয়া যাইতেছে। যে দেশ আধুনিক শিল্পের দিক হইতে অধিক অগ্রসর তাহার প্রভাব অল্প-অগ্রসর দেশগুলির উপর বিস্তৃত হইবেই। প্রথমোক্ত দেশে যাহা আজ সম্ভব ইহয়াছে অনুন্নত দেশগুলিতেও তাহা পরবর্তী সময়ে সংগঠিত না হইয়া পারিবে না।
সবেমাত্র শিল্পোন্নতি শুরু হইয়াছে এইরূপ দেশগুলির উপর পীড়ন হয় দুইদিক হইতে। নবোথিত পুঁজিতন্ত্রের অত্যাচার তো সেখানে থাকিবেই, তাছাড়া গতায়ু ফিউদ-তন্ত্রও মরণ কামড় দিতে ছাড়ে না। ইংল্যান্ডের মতন দেশে কারখানা-শিল্প উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে, তাই সেখানে ফ্যাক্টরি আইনের প্রয়োজন অনুভূত হইয়াছে এবং অবশেষে তাহা প্রবর্তিত হইয়াছে। কিন্তু মার্কসের সময় অনুন্নত জার্মানিতে তাহা সম্ভবপর হয় নাই। অনুন্নত দেশে পুঁজিতন্ত্রের অপরিণত বিকাশ হইতে উদ্ভূত অত্যাচার তো থাকেই তা ছাড়া পুরাতন উৎপাদন-বিধির নির্যাতনও তাহাকে সহ্য করিয়া যাইতে হয়। এই অবস্থাটিকে মার্কস বলিয়াছেন, ‘We suffer not only from the living, but also from the dead’ সকল অনুন্নত দেশই শুধু বর্তমানের চাপেই গুমড়ায় না, অতীতের দুঃসহ ভারও তাহাকে সহ্য করিয়া যাইতে হয়।
আঠার শতকে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ দ্বারাই ইউরোপের মধ্যবিত্তশ্রেণীর জাগরণ সূচিত হয়। ঊনবিংশ শতকে আবার আমেরিকাই গৃহযুদ্ধ শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির ইঙ্গিত জানায়। মার্কসের সময়ে ইংল্যান্ডে সামাজিক ভাঙন খুবই স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। অচিরেই ইহার প্রতিক্রিয়া ইউরোপেও অনুভূত হয়। শ্রমিকশ্রেণীর বিকাশ সেখানে কতখানি সম্ভব হইবে তাহার উপরই নির্ভর করিবে এই প্রতিক্রিয়া কত সহজে অথবা কত কঠোরভাবে ইউরোপে রূপ পরিগ্রহ করিতে পারিবে। কোনও উচ্চ এবং মহৎ ভাবের অনুপ্রেরণায় নয়, যদি আপন শ্রেণীস্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখিতে হয় তবে শ্রমিকশ্রেণীর বিকাশের পক্ষে যে সকল অন্তরায় রহিয়াছে আইনের সাহায্যে তাহা দূর করা শাসকশ্রেণীর পক্ষে নিতান্ত প্রয়োজন। মার্কস তাই তাহার মূলগ্রন্থ ‘কেপিটেলে’ ইংল্যান্ডে ফ্যাক্টরি-আইন এবং তাহার ফলাফল সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করিয়াছেন। কেননা একটি জাতি অপর একটি জাতির অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা লইতে পারে। মার্কস কখনো কোনো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments